প্রায় সাড়ে চারশো কোটি বছরের বিবর্তনে উদ্ভব হয়েছে বর্তমান প্রাণীকূলের। ২০২১ সালের হিসেব অনুযায়ী এখন পর্যন্ত প্রায় ২১.৩ লক্ষ প্রাণী প্রজাতি’র খোঁজ পাওয়া গিয়েছে। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন প্রজাতি আবিষ্কৃত হচ্ছে। প্রতিটি প্রজাতিই এসেছে বিবর্তনের মাধ্যমে এবং বর্তমানে সেসকল প্রাণীদের মধ্যে নিরবিচ্ছিন্নভাবে বিবর্তন ঘটে চলছে। মানুষের কথাই ধরা যাক!

এখন পর্যন্ত ‘হোমো’ গণের ১৩ টি প্রজাতি আবিষ্কৃত হয়েছে। ভবিষ্যতে আরো কয়েকটি প্রজাতি খুঁজে পাওয়ার ভালোই সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এতগুলো প্রজাতির মধ্যে বর্তমানে টিকে রয়েছে মাত্র ১ টি প্রজাতি। হ্যাঁ, আর সেটি হলো ‘হোমো সেপিয়েন্স’। আমরা আমাদের আশেপাশে যত মানুষ দেখতে পাই; পৃথিবীর প্রায় ৮ বিলিয়ন মানুষ; সবাই হোমো সেপিয়েন্স প্রজাতির অন্তর্গত। তবে এখন থেকে মাত্র পঞ্চাশ হাজার বছর পেছনে গেলেও মানুষের আরো কয়েকটি প্রজাতি খুঁজে পাওয়া যেত। এখন সবার মনে হতে পারে হোমো সেপিয়েন্স’ এ এসে মানুষের বিবর্তন থেমে গিয়েছে; এখন আর নতুন প্রজাতির উদ্ভব সম্ভব নয়! নাহ,ব্যাপারটা আসলে সত্য নয়। বিবর্তন নদীর মতো প্রবাহমান একটি প্রক্রিয়া। প্রতিটি প্রাণী প্রজাতির মধ্যেই প্রতিনিয়ত বিবর্তন ঘটে চলছে। মানুষও তার ব্যতিক্রম নয়। আজ আমরা জানবো আধুনিক মানুষ কিংবা হোমো সেপিয়েন্স দের মধ্যে ঘটা এবং ঘটতে থাকা সাম্প্রতিক কিছু মাইক্রোবিবর্তন সম্পর্কে।

মস্তিষ্কের আকার পরিবর্তনঃ

মানুষের বিবর্তনের ধারায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে মানুষের মস্তিষ্কে। সেই প্রাচীন এইপ’দের থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত মানুষের মস্তিষ্কের আকার ধীরে ধীরে বেড়েছে। হোমো গণের প্রথম দিকের প্রজাতি হোমো হাবিলিস’দের মস্তিষ্কের আকৃতি ছিল মাত্র ৬০০ ঘন সেন্টিমিটার। পরবর্তীতে সেই পরিমাণ বেড়ে গিয়ে হোমো নিয়ান্ডারথাল’দের মস্তিষ্কের আকৃতি হয়েছে ১৬৮০ ঘন সেন্টিমিটার। ব্যাপক পরিবর্তন!

তবে যদি হোমো সেপিয়েন্স দের কথা উঠে,তাহলে সমীকরণ’টি কিন্তু একটু অন্যরকম হয়। বিগত ৩০ হাজার বছরে হোমো সেপিয়েন্স’দের মস্তিষ্কের আকার ছোট হয়েছে প্রায় ১০ শতাংশ৷ এসময় মস্তিষ্কের আকার ১,৫০০ থেকে কমে ১,৩৫৯ ঘন সেন্টিমিটার হয়েছে৷ অর্থাৎ একটি টেনিস বলের সমান ঘনত্ব হ্রাস পেয়েছে৷ আর মস্তিষ্কের এই পরিবর্তন শুধু পুরুষদের ক্ষেত্রেই নয়৷ বরং নারীদের মস্তিষ্কেও ঘটেছে একই ধরণের পরিবর্তন৷ মস্তিষ্কের আকার ছোট হলেও তাতে মানুষ আরো নির্বোধ হয়েছে এমনটি নয়৷ বরং মানুষের বুদ্ধিমত্তা আরো প্রখর হয়েছে।

 

গড় আয়ুষ্কাল বৃদ্ধিঃ

মানুষের বিবর্তনের আরেকটা প্রভাব দেখা যায় মানুষের আয়ু বৃদ্ধিতে। কয়েক কোটি বছর আগে প্রাইমেট’দের আয়ুষ্কাল ছিল মাত্র কয়েক বছর। ধীরে ধীরে সেটি বেড়েছে। মানুষের পূর্বপুরুষ’রা যখন বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতো,তখন বিভিন্ন ইনফেকশন এর কারণে তাদের মৃত্যুহার বেশি ছিল। মাত্র ২০ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীতে চষে বেড়ানো হোমো হাবিলিস’দের গড় আয়ু ছিল প্রায় ১৩ বছর। মানুষের বিবর্তনের ধারায় সেটি ধীরে ধীরে বেড়েছে। হোমো নিয়ান্ডারথাল প্রজাতির সদস্যদের বেশিরভাগই ৪০ বছর পার হওয়ার আগেই মারা যেতো। মাত্র ৫০০০ বছর আগেও মানুষের গড় আয়ু ছিল ৪০ বছর। বর্তমানে সেটি দ্বিগুণের তুলনায় অনেক বেশি বেড়ে গিয়েছে।

১৮০০ সালের পর মানুষের গড় আয়ু প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। মূলত জলবায়ু’র পরিবর্তন,খাদ্যাভ্যাস এবং নানা মরণব্যাধি’র প্রতিষেধক আবিষ্কারই এই পরিবর্তনে বড় প্রভাব ফেলেছে। গড় আয়ু বৃদ্ধির ফলেই মানব প্রজাতি পুরো পৃথিবী দখল করতে সক্ষম হয়েছে এবং মহাকাশেও বিচরণ করছে। এখানেই ‘যোগ্যতমের উদ্বর্তন’ কথাটা আসে।

 

অধিক উচ্চতায় অক্সিজেন স্বল্পতায় বেঁচে থাকার ক্ষমতা লাভঃ

সাধারণ মানুষের পক্ষে অধিক উচ্চতায় বসবাস করা সাধারণত কষ্টকর হয়।কারণ অধিক উচ্চতায় রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ কমতে থাকে। তবে পৃথিবীর বহু জাতিগোষ্ঠীর মানুষ’ই উঁচু পাহাড়ের চূড়াকে তাদের বাসস্থান বানিয়ে নিয়েছে। তিব্বত,আন্দিজ এবং ইথিওপীয় অঞ্চলের মানুষজন এরই জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ। এরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এসব অঞ্চলের পাহাড়ে;সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২৫০০ মিটার উপরে বসবাস করে আসছে। যেখানে পৃথিবীর অন্য অঞ্চলের মানুষদের এসব জায়গায় ঘুরতে গেলেই অসুবিধা হয়,সেখানে এরা স্বাভাবিকভাবেই বসবাস করেছে। বহু বছরের অভিযোজন এদের জিনে পরিবর্তন এনেছে;ফলে এদের বেঁচে থাকার ক্ষমতা বেড়েছে। এসব অঞ্চলের মানুষের রক্ত সংবহন তন্ত্রে অক্সিজেন পরিবহনের পরিমাণ সাধারণ অঞ্চলের চেয়ে বেশি। এদের পরিমাণ কিন্তু নেহাতই কম নয়। প্রায় ৮১.৬ মিলিয়ন মানুষ এসব অঞ্চলে বসবাস করে। তাদের এই অভিযোজনের ক্ষমতা’কে বিজ্ঞানীরা প্রাকৃতিক নির্বাচন এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বিজ্ঞানীদের ধারণা ১০০০-৭০০০ খৃষ্টপূর্বাব্দের মধ্যবর্তী সময়কালে তিব্বতের অধিবাসীরা এই ক্ষমতা অর্জন করে (মিউটেশন ঘটে)।

 

দুগ্ধজাত খাবার হজমের ক্ষমতা লাভঃ

ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স হলো এমন এক অবস্থা যেখানে ক্ষুদ্রান্ত্রে ল্যাকটেজ এনজাইমের অভাব হয়, যে শর্করা ল্যাকটোজ হজম করতে সাহায্য করে। ল্যাকটোজ একটি ডাইস্যাকারাইড, যা ল্যাকটেজ নামক এনজাইমের মাধ্যমে ভেঙে গ্লুকোজ ও গ্যালাক্টোজে রূপান্তরিত হয়। এ ল্যাকটেজ এনজাইমের অভাবেই ল্যাকটোজ ভাঙতে পারে না। ফলে অসহনশীলতা বা ইনটলারেন্স দেখা যায়। ফলে দুধ খেলেই পেটে ব্যথা ও পাতলা পায়খানা হতে পারে। এ ছাড়া বমি ভাব, পেট ফুলে থাকা, পেট ভার হওয়া, পেটে গ্যাস হওয়া ইত্যাদি দেখা দেয়।

প্রায় সব স্তন্যপায়ী’রাই জীবনের একটা নির্দিষ্ট সময় পর দুধ হজমে অক্ষম হয়ে পড়ে। মূলত weaning (বুকের দুধ ছাড়ানো) এর পরপরই স্তন্যপায়ীদের ‘ল্যাকটেজ এনজাইম উৎপন্নকারী জিন’ কাজ করা বন্ধ করে দেয়। ফলে পরবর্তী জীবনে দুধ খেলে বদহজম সহ নানা পেটের অসুখ হয়;দুধ হজম হয় না। বর্তমানে আমাদের আশেপাশের অনেক মানুষই বয়স্ক হলে দুগ্ধজাত খাবার হজমে ব্যর্থ হয়। আবার,অনেকে দিব্যি সেসব খাবার হজম করতে পারে। এই ভিন্নতার কারণও লুকিয়ে আছে বিবর্তনের মাঝে। আমেরিকার প্রায় ১০ শতাংশ অধিবাসী, আফ্রিকার ১০ শতাংশ এবং চীনের প্রায় ৯৯ শতাংশ অধিবাসী’ই দুগ্ধজাত খাবার হজম করতে পারে না। তবে বাকি লোকেরা ঠিকই সেসব খাবার হজম করে ফেলে। মূলত মিউটেশনের কারণে ল্যাকটেজ এনজাইম এর ধারক জিনের পরিবর্তনে এমনটি ঘটেছে। প্রাচীন ইউরোপীয়’দের থেকে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে দুগ্ধজাত খাদ্য হজমের ক্ষমতা আমাদের মাঝে এসেছে বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা। মানুষের অন্যান্য পূর্বপুরুষ কিংবা কাজিন প্রজাতি’দের মাঝে দুগ্ধজাত খাবার হজমে অক্ষমতা লক্ষ করা যায়। তাই এটিও মানুষের শরীরে সাম্প্রতিক বিবর্তনের একটি অন্যতম উদাহরণ।

 

হাতের পেশীতে নতুন ধমনীর উদ্ভবঃ

মানুষের বিবর্তনের সবচেয়ে সাম্প্রতিক এবং উল্লেখযোগ্য প্রমাণ হলো মানুষের হাতের পেশীতে নতুন ধমনীর উদ্ভব। অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড ইউনিভার্সিটি এবং ফ্লিন্ডার্স ইউনিভার্সিটির গবেষকরা পর্যবেক্ষণ করে দেখেছেন যে, মানুষের হাতের সামনের অংশে অর্থাৎ ফোরআর্মের মাঝখানে একটি নতুন ধমনী (Artery) তৈরি হচ্ছে।১৮৮০ এর দশকে, এই নতুন ধমনী-সহ বিশ্বে মানুষের সংখ্যা ছিল ১০ শতাংশ। কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে জন্মগ্রহণকারীদের ৩০ শতাংশের মধ্যে এই ধমনীর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গিয়েছে।

বিজ্ঞানীরা নতুন আবিষ্কৃত ধমনীটির নাম দিয়েছেন মিডিয়ান আর্টারি

একটা মানবশিশু যখন মায়ের গর্ভে থাকে তখন হাতে রক্ত সঞ্চালনের জন্য এই ধমনীটি (median artery) তৈরি হয়। কিন্তু পরবর্তীতে বড় হওয়ার সাথে সাথে ধমনীটি আরো দুইটি ধমনীতে বিভক্ত হয়ে যায়(radial and ulnar arteries)। এটাই সাধারণত হয়ে থাকে। তবে অনেক মানুষের ক্ষেত্রে ৩টা ধমনীই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে; জিনে সেভাবেই কোড করা থাকে। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন ১৮ শতকের আগে জন্মগ্রহণ করা ১০ শতাংশ মানুষের শরীরে ৩ টা ধমনীর অস্তিত্ব রয়েছে। কিন্তু এরপরই ধীরে ধীরে সেটা বেড়েছে এবং বর্তমানে ৩০ শতাংশ মানুষের হাতের পেশিতে এই ধমনীর উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা আরো ধারণা করছেন,১০০ বছর পর হয়তো পুরো মানবজাতির হাতের পেশিতে তিনটা ধমনী উপস্থিত থাকবে।অর্থাৎ নতুন বৈশিষ্ট্যের উদ্ভব ঘটছে মানুষের শরীরে। বিবর্তন!(ছবিতে দেখানো হয়েছে)। এরকম আরো একটা উদাহরণ হলো বর্তমানে জন্মগ্রহণ করা শিশুদের চোয়ালে আক্কেল দাঁতের অনুপস্থিতি।

এছাড়াও মানুষের মাঝে অধিক সময় ধরে পানিতে অবস্থান (Free dive) করার ক্ষমতা, ত্বকের উজ্জ্বলতা এবং চোখের রঙের পরিবর্তন, নিম্ন রক্তচাপ, শরীরে কোলেস্টেরল এর পরিমাণ পরিবর্তন, আলঝেইমার রোগের প্রাদুর্ভাব, ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি, মেয়েদের বিভিন্ন শারীরিক অবস্থার (menarche and menopause) পরিবর্তন সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মাইক্রো বিবর্তন এর প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে।

 

তথ্যসূত্রঃ 

  1. https://ourworldindata.org/how-many-species-are-there#:~:text=The%20IUCN%20Red%20List%20tracks,million%20species%20on%20the%20planet.
  2. https://en.m.wikipedia.org/wiki/Homo
  3. https://pubmed.ncbi.nlm.nih.gov/9750968/#:~:text=In%20a%20sample%20of%2045,a%20decrease%20in%20body%20size.
  4. https://www.pnas.org/doi/10.1073/pnas.0909606106#:~:text=Humans%20have%20evolved%20much%20longer,minimized%20mortality%20at%20earlier%20ages.
  5. https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pmc/articles/PMC5161537/
  6. https://evolution.berkeley.edu/evo-news/got-lactase/#:~:text=The%20lactose%20tolerance%20mutation%20arose,populations%20that%20depended%20on%20dairying.
  7. https://www.discovermagazine.com/the-sciences/what-the-discovery-of-an-extra-artery-means-for-human-evolution#:~:text=The%20mysterious%20additional%20artery%20in,around%20the%20eight%2Dweek%20mark.
  8. https://en.m.wikipedia.org/wiki/Recent_human_evolution#:~:text=Recent%20human%20evolution%20refers%20to,Paleolithic%20about%2050%2C000%20years%20ago.

লেখকঃ রাজেশ মজুমদার