রাহুল তার মামার বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। রাতের ডিনার শেষ করে তার মামাতো ভাই অনিকের সাথে ঘুমাতে গেলো। সারাদিন গ্রামে ঘুরে বেড়িয়ে দুজনেই খুব ক্লান্ত তাই তারা ঘুমিয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর রাহুল কোনো কিছুর নড়াচড়া অনুভব করে জেগে উঠলো।

রাহুল রুমের লাইট অন করতেই দেখতে পেলো অনিক ঘুমের মধ্যে অদ্ভুত কিছু আচরণ করছে। তার শারীরিক অঙ্গভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে সে স্বপ্নে কারো সাথে সঙ্গমে লিপ্ত।মাঝেমধ্যে অনিকের কণ্ঠ দিয়ে সেই রকম কিছু শব্দ‌ও বেরিয়ে আসছে। ঘুমের মধ্যেই অনিকের যৌন উত্তেজনা যে বৃদ্ধি পাচ্ছে তা রাহুল স্পষ্ট বুঝতে পারছে।

দুই তিন মিনিট পর অনিক যখন ঘুমের মধ্যেই হস্তমৈথুন করার প্রস্তুত হচ্ছে এর আগেই রাহুল অনিকের গায়ে পানি ছিটিয়ে তাকে জাগিয়ে দিলো।অনিক জেগে উঠার পরে রাহুল তার আচরণ দেখে বুঝতে পারলো কিছুক্ষণ আগের ঘটনা অনিকের মনে নেই। রাহুল অনিকের কাছে পুরো ঘটনা বিস্তারিত বললো। অনিক শুনে বেশ অবাক হয়েছে।

কী হয়েছে অনিকের? অনিক কি কোনো স্বপ্ন দেখছিলো যার জন্য ঘুমের মধ্যে যৌন আচরণ প্রদর্শন করছিলো? নাকি এটা কোনো রোগ?

ঘুমের মধ্যে হাঁটা, ঘুমের মধ্যে কথা বলা, ঘুমের মধ্যে ড্রাইভিং করা ইত্যাদি ঘটনা হয়তো শুনে থাকতে পারেন কিন্তু ঘুমের মধ্যে সেক্স করতে কখনো শুনেছেন? ঘুমের মধ্যে সেক্স করাও এক ধরনের রোগ যেটির পোশাকি নাম ‘সেক্সসোমনিয়া’। এটি প্যারাসোমনিয়ার শ্রেণিভুক্ত একটি শারীরিক ব্যাধি,আর প্যারাসোমনিয়া মূলত ঘুমের মধ্যে হাঁটা, কথা বলা ইত্যাদি লক্ষণ যুক্ত রোগ। সেক্সসোমনিয়াকে অনেক সময় স্লিপ সেক্স‌ বলা হয়।
তো এক কথায় কোনো ব্যক্তি ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় নিজের অজান্তেই যদি যৌন আচরণ করে তবে সে সেক্সসোমনিয়া বা স্লিপ সেক্সে আক্রান্ত বলা যায়। আচ্ছা এবার দেখা যাক সেক্সসোমনিয়া সম্পর্কে বিভিন্ন জার্নালের মন্তব্য কি।

সেক্সসোমনিয়া সম্পর্কে ২০১৮ সালে কিউরিয়াস জার্নালের একটি সমীক্ষায় দেখা যায় যে বিশ্বব্যাপী প্রাপ্তবয়স্কের জনসংখ্যার প্রায় ৭.১% জীবনের কোনো না কোনো সময়ে সেক্সসোমনিয়া আক্রান্ত হবে।২০০৭ সালে সোশ্যাল সাইকিয়াট্রি অ্যান্ড সাইকিয়াট্রিক এপিডেমিওলজি জার্নালের একটি গবেষণাপত্র অনুসারে সেক্সসোমনিয়া নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে বেশি দেখা যায়।

এবার সেক্সসোমনিয়া বা স্লিপ সেক্সের লক্ষণ সম্পর্কে জানা যাক। তার আগে একটি বিষয় ক্লিয়ার করে নিতে চাই যে অনেকেই স্লিপ সেক্স আর সেক্স ড্রিম দুটোকে এক‌ই মনে করে কিন্তু আদতে দুইটি ভিন্ন। সেক্স ড্রিম অপ্রাপ্তবয়স্ক, প্রাপ্তবয়স্ক উভয়ের হতে পারে এবং এটি আমাদের জীবনের স্বাভাবিক একটি বৈশিষ্ট্য। কিন্তু সেক্সসোমনিয়া বিরল রোগ।সাধারণত সেক্সসোমনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি বুঝতে পারেন না যে সে সেক্সসোমনিয়ায় আক্রান্ত। সেই ব্যক্তির সেক্স পার্টনার, রুমমেট অথবা পরিবারের কেউ যারা ঘুমের মধ্যে তার যৌন আচরণ লক্ষ্য করে তারা বুঝতে পারে যে ঐ ব্যক্তি সেক্সসোমনিয়ায় আক্রান্ত।

সাধারণত স্লিপ সেক্সে আক্রান্ত ব্যক্তিরা নিম্ন ঘুমের মধ্যে উল্লিখিত আচরণ গুলো করে থাকে। যেমনঃ

  • শয্যাসঙ্গীর সাথে যৌন আচরণ করা এবং তাকে সঙ্গমে লিপ্ত করার চেষ্টা করা।
  • পেলভিক থ্রাস্টিং করার চেষ্টা করা। পেলভিক মূলত হচ্ছে তলপেটের নিচের অংশ। স্লিপ সেক্সে আক্রান্ত ব্যক্তিরা অনেক সময় ঘুমের মধ্যে নিজের পেলভিক অংশকে বিভিন্ন ভাবে নড়াচড়া করার মাধ্যমে নিজের যৌন উত্তেজনাকে প্রকাশ করে। এছাড়াও এমন অনেক আচরণ করে যা দেখে যৌন মিলনের অনুকরণ মনে হবে।
  • হস্তমৈথুন করা। পুরুষের তুলনায় নারীদের মধ্যে হস্তমৈথুন বেশি লক্ষ্য করা যায়।
  • অর্গাজম বা যৌন উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়া।
  • অচেতন অবস্থায় শয্যাসঙ্গীর সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হওয়া। তবে অনেক ক্ষেত্রে এই সময় চোখ খোলা অবস্থায়‌ থাকতে পারে।
  • ঘুম থেকে জাগার পর ঘুমের মধ্যে যৌন আচরণ সম্পর্কে কিছু মনে করতে না পারা।

এবার স্লিপ সেক্সে আক্রান্ত হ‌ওয়ার কিছু কারণ সম্পর্কে জানা যাক। যদিও স্লিপ সেক্সের কারণ সম্পর্কে এখনো গবেষকদের স্পষ্ট কোনো ধারণা নেই তবে ডাক্তাররা স্লিপ সেক্সের জন্য দায়ী কিছু কারণ সম্পর্কে বলে থাকে। যেমনঃ

  • ঘুম কম হওয়া বা অনিয়মিত ঘুম
  • মানসিক চাপ বৃদ্ধি
  • উদ্বেগ ও ক্লান্তি
  • নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অথবা ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতীত কোন ওষুধ সেবন
  • অ্যালকোহল পান

এইসকল কারণ ছাড়াও অন্য কোনো স্নায়ুবিক রোগে আক্রান্ত থাকলেও সেক্সসোমনিয়া হ‌ওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। যেমনঃ

  • নিদ্রাজনিত যেকোনো স্নায়বিক ব্যাধি
  • রেস্টলেস লেগ্স সিনড্রোম
  • অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া
  • ঘুম-সম্পর্কিত এপিলেপসি বা মৃগীরোগ
  • গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ (GERD)
  • মাথায় কোন ধরনের আঘাত প্রাপ্ত হলে
  • মাইগ্রেনের সমস্যা থাকলে

সাধারণত সেক্সসোমনিয়া বা স্লিপ সেক্স আমাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে খুব বেশি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না। সেক্সসোমনিয়া আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে নিম্নে উল্লেখিত গৌণ প্রভাব দেখা যায়। যেমনঃ

  • রাগান্বিত অনুভব করা
  • সিদ্ধান্ত নিতে বিভ্রান্ত হ‌ওয়া
  • কোন বিষয়বস্তুর সত্যতা বা বাস্তবতাকে অস্বীকার করার প্রবণতা দেখা যায়
  • আক্রান্ত ব্যক্তি মানসিক ভাবে হতাশ, লজ্জিত ও অপরাধবোধে ভুগে।
  • চিন্তাধারার মধ্যে বিশাল পরিবর্তন আসতে পারে।

এবার জানা যাক অনিকের ঘুমের মধ্যে যৌন উত্তেজনার সৃষ্টি হলো কিভাবে। অনিক আর রাহুল ঘুমাচ্ছে। সারাদিনে ব্রেনের জোগাড় করা বিভিন্ন তথ্য অনিকের লং টার্ম মেমোরিতে জমা হচ্ছে। প্রায় ছয় ঘন্টা মতো ঘুমাবে সে,প্রায় চারটা স্লিপ সাইকেলের মধ্য দিয়ে যাবে।

প্রতিটি স্লিপ সাইকেলের ধাপ প্রধানত দুটি: NREM (Non Rapid Eye Movement) এবং REM (Rapid Eye Movement);NREM-এর আবার তিনটি ধাপ। মূলত এই NREM ধাপেই সেক্সসোমনিয়ার প্রবণতা দেখা শুরু হয়।

অনিক এখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তার স্লিপ সাইকেলের NREM-এর ৩য় ধাপ শুরু হয়েছে। ঠিক সেই মুহূর্তে ঘুমের ঘোরে রাহুলের শরীরের সাথে অনিকের শরীরের স্পর্শ লেগে যায় এবং অনিকের মস্তিষ্ক আংশিক জাগ্রত হয়।স্লিপ সাইকেলের NREM ধাপে মস্তিষ্ক হঠাৎ জাগ্রত হলে মস্তিষ্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানুষের মৌলিক প্রবৃত্তি বা আদিম আচরণ (খাওয়া, যৌনতা, হাঁটা, ভয় ইত্যাদি) প্রদর্শন করে। যার জন্য অনিক ঘুমের মধ্যে এখন যৌন আচরণ প্রদর্শন করছে।

এবার হয়তো মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে রাহুল তো আজকে এসেছে তার মামার বাড়িতে। আজকে অনিকের সাথে ঘুমাতে গিয়ে রাহুলের শরীরের স্পর্শে অনিকের মধ্যে সেক্সসোমনিয়ার লক্ষণ দেখা গেছে। অন্য সময় কি সেক্সসোমনিয়ার লক্ষণ দেখা যায়নি?

শুধু শয্যাসঙ্গীর স্পর্শের কারণেই সেক্সসোমনিয়ার লক্ষণ প্রকাশ পায় না। বাহ্যিক শব্দ বা হঠাৎ তাপমাত্রা পরিবর্তনের ফলেও স্লিপ সেক্সের লক্ষণ দেখা দিতে পারে।অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি যাদের গলার পেশি মাঝে মাঝে শিথিল হয়ে যায় এবং ঘুমের সময় শ্বাসনালী বন্ধ হয়ে যায় তাদের মধ্যে সেক্সসোমনিয়া লক্ষণ দেখা দিতে পারে পারে। কারণ ঘুমের মধ্যে শ্বাসকষ্টের কারণে অথবা শ্বাসরোধ বা হাঁপানোর শব্দ থেকে মস্তিষ্ক আংশিক জেগে উঠতে পারে এবং স্লিপ সেক্সের লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে।
এছাড়াও মানসিক চাপ থেকেও সেক্সসোমনিয়ার লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে। এখানে উল্লেখ্য অতৃপ্ত যৌন চাহিদার সাথে সেক্সসোমনিয়ার কোনো সম্পর্ক নেই।

রাহুল অনিকের এই যৌন আচরণ গুলো খাতায় নোট করে নিয়েছে। সেইসাথে অনিকের মেডিকেল হিস্ট্রি‌ এবং সে সাধারণত কত ঘন্টা ঘুমায় সেগুলো‌ও নোট করেছে। অনিককে নিউরোলজিস্টের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো।

ডাক্তার অনিকের পলিসমনোগ্রাফি টেস্ট করাবে। পলিসমনোগ্রাফি মূলত হচ্ছে ঘুমন্ত অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা। রাত দশটা, অনিক ঘুমিয়ে পড়েছে। ডাক্তার তার ব্রেইন ওয়েভস বা মস্তিষ্কের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছে।এরপর একে একে অনিকের হার্ট রেট, শ্বাস প্রশ্বাস, চোখ ও পায়ের নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করেছে। পলিসমনোগ্রাফি করা শেষ। ডাক্তার অনিককে কিছু ঔষধ দিয়েছে এবং নিয়মমাফিক চলার নির্দেশ দিয়েছে।
যদিও নিউরোলজিস্ট মাত্র একবার অনিকের ঘুম পর্যবেক্ষণ করেছে তবে অনেক ক্ষেত্রে ডাক্তার একাধিক বার পলিসমনোগ্রাফি করতে পারে যা রোগ নির্ণয় করতে আরো সাহায্য করতে পারে।

এবার স্লিপ সেক্স কিভাবে প্রতিরোধ করতে পারেন তার দুয়েকটি উপায় সম্পর্কে বলি।

  • বড় বিছানায় ঘুমানো, যাতে শয্যাসঙ্গীর শরীরের সাথে স্পর্শ না লাগে।
  • শিশু ও অপরিচিতদের সাথে না ঘুমানো।
  • ঘুমাতে যাওয়ার কয়েক ঘন্টা আগে অ্যালকোহল বা ক্যাফিন বা ড্রাগস গ্রহণ না করা।

তথ্যসূত্রঃ

1. https://www.healthline.com/health/sleep-sex#diagnosis

2. https://www.livescience.com/what-is-sexsomnia#section-what-triggers-sexsomnia

3. https://en.m.wikipedia.org/wiki/Sleep_sex

 

লেখকঃ জয়ন্ত শেখর গুপ্ত জয়