পরীক্ষার বাকি ১৫ দিন, কিন্তু পড়তে বসেন না, বসতেও ইচ্ছে করে না। বসবেন ঠিক পরীক্ষার আগের রাতে।

স্যার এসাইনমেন্ট দিয়েছে, সময় পাচ্ছেন একদিন, কিন্তু সারাদিন আড্ডা মেরে, সন্ধ্যায় গল্প করে লিখতে বসেন ঘুমানোর আগে।
ছোট্ট একটা কাজ, সর্বোচ্চ আধঘন্টা সময় দিলেই হয়ে যাবে। কিন্তু জমিয়ে রেখেছেন সপ্তাহের পরে সপ্তাহ!
কী? নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছেন?  ব্যাপার না, অধিকাংশ মানুষই এরকম। গড়িমসি করতে করতে সময়ের কাজ সময়ে না করে, করবে ডেড লাইনে বা তারও বা পরে। ফলে প্রফেশনাল লাইফ থেকে পার্সোনাল লাইফ সর্বত্রই হয়ে উঠেন লেইট লতিফ এবং একজন ব্যর্থ মানুষ।

এই যে ‘পরে করব পরে করব’ বলে কাজ জমিয়ে রাখা, এটাকে আমরা বলি গড়িমসি। আরেকটু পণ্ডিতি ভাষায় বলা যায় – দীর্ঘসূত্রতা। ইংরেজিতে বলে procrastination ।

মাঝেমধ্যে একটু আধটু গড়িমসি করা স্বাভাবিক। কিন্তু সেটা যদি বেশি বেশি হয় এবং দীর্ঘমেয়াদি হয় তাহলে বিষয়ট সিরিয়াসলি নিতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে গড়িমসি স্বভাব চলতে থাকলে সেট শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপর বিরুপ প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন – দুশ্চিন্তা ও হতাশা বেড়ে যাওয়া।
সাধারণত আমরা যেসব কারণে কোনো কাজে গড়িমসি করে থাকি সেসব নিয়ে যদি বলতে যাই তাহলে বেশ কিছু বিষয় আসে। যেমন –
১. কী করতে হবে, কীভাবে করতে হবে তা সঠিক ও বিস্তারিতভাবে না জানা।
২. কাজটির প্রতি অনীহা অথবা ডোন্ট কেয়ার ভাব থাকা।
৩. কোথা থেকে শুরু করতে হবে তা বুঝতে না পারা।
৪. ওভারকনফিডেন্ট থাকা। আরে এইটা তো সহজ, পাঁচ মিনিটে করে ফেলব- এরকম মনোভাব থাকা।
৫. প্রেসার নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করা।
৬. এক্সকিউজ তৈরী করতে ওস্তাদ হওয়া। এখন না করে আরও পরে করলে পার্ফেক্ট হবে- এসব ভাবা।
৭. এই কাজ করে ঐ কাজ করব, সবগুলো একসাথে বসে করব – এরকম ভাবা।
তবে গড়িমসি যদি অতিরিক্ত পরিমাণে হয়, কাজ করার জন্য কোনো প্রকার শারীরিক এবং মানসিক উদ্দীপনা না পান তাহলে হয়তো আপনার অন্য কোনো সমস্যা আছে এবং গড়িমসি স্বভাব সেসব সমস্যা বা রোগেরই লক্ষণ।
গড়িমসি স্বভাবের সাথে সম্পর্কিত কিছু শারীরিক ও মানসিক ইস্যু-
১. ডিপ্রেশন : দীর্ঘদিন ধরে ডিপ্রেশনে থাকলে আপনার স্মৃতি শক্তি, মনোযোগ, চিন্তাশক্তি সহ যাবতীয় বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা ব্যহত হতে পারে। ফলে কোনো সিম্পল কাজ করতে গিয়েও অনেক কঠিন মনে হবে এবং কাজ করার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। কাজের প্রতি ভয় তৈরী হবে এবং অহেতুক গড়িমসি করবেন।
২. OCD : Obsessive-Compulsive Disorder বা OCD হচ্ছে এক ধরনের মেন্টাল ইস্যু যার কারণে কোনো ব্যাক্তি একই কাজ বারবার করে, খুঁতখুঁতে স্বভাবের হয়, কোনো কিছুর প্রতি অবসেশন থাকে।
আপনার যদি ওসিডি থাকে তবে আপনি কাজ করতে ভয় পেতে পারেন, পাছে আপনার ভুল হয়। এই পার্ফেক্ট না হওয়ার ভয় থেকে প্রচ্চুর গড়িমসি করতে পারেন।
৩. ADHD : এটা নার্ভের একটা রোগ যা সাধারণত বাচ্চাদের মধ্যে বা বাচ্চাকালে বেশি দেখা যায়। তবে প্রাপ্তবয়ষ্কদের মধ্যেও এটি দেখা যায়। এই রোগে আক্রান্ত ব্যাক্তির প্রধান সমস্যা হয় মনোযোগ ধরে রাখতে। বুঝতেই পারছেন মনোযোগ ধরে রাখতে না পারলে যেকোনো কাজই বিরক্তিকর মনে হবে এবং বেশিক্ষণ কাজটি করতে পারবেন না। পরে করবেন বলে রেখে দিবেন।
কারণ নিয়ে তো অনেক কথা হলো, এবার তবে মুক্তির উপায় নিয়ে আলাপ করি। এগুলো আপনিও হয়তো জানেন কিন্তু মেনে চলেন না। তবে মুক্তি পেতে হলে এসব মেনে চলতে হবে-
  • টু ডু লিস্ট করা : কোনো একদিনে আপনাকে যেসব কাজ করতে হবে সেসবের একটা লিস্ট করে ফেলুন, সকালে বা তার আগের দিন রাতে। তারপর সেটি সচরাচর চোখ পড়ে এরকম জায়গায় সেটে দিন অথবা ফোনে রিমাইন্ডার দিয়ে সেইভ করে রাখুন।
  • প্ল্যানিং করা : একটা কাজ কীভাবে করতে হবে, কোথা থেকে শুরু করতে হবে তা নিয়ে প্ল্যানিং করে ফেলুন। এতে অবশ্য বেশি সময় লাগবে না। একবার প্ল্যানিং করে ফেললে কাজটার প্রতি ভয় সেরে যাবে, উৎসাহ পাবেন।
  • কাজটিকে ছোট ছোট ভাগ করুন : কোনো কাজ যদি খুব বড়ো এবং কঠিন হলে স্বভাবতই কাজটির প্রতি আমাদের ভয় এবং অনীহা কাজ করে। সেক্ষেত্রে আমাদের উচিত আগে কাজটির প্ল্যানিং করা। তারপর কাজটিকে ছোট ছোট ভাগ করা। ভাবুন- একটি অংশ করে ফেললেন মানে কাজটি আরও সহজ হয়ে গেল। বাচ্চাকালে মায়েরা যেমন আমাদের খাবারের থালায় ছোট ছোট ভাগ করে রাখতেন সেভাবে!
  • গড়িমসির লাভ-ক্ষতি ভাবুন : কাজটি যথাসময়ে না করা হলে কী কী ক্ষতি হতে পারে বা আপনার উপরে কীরূপ প্রভাব ফেলতে পারে তা ভাবুন। গবেষণায় দেখা গেছে এতে করে অনেক অলস মানুষও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ করে ফেলতে পারে!
  • ওয়ার্কিং প্লেসকে যথাসম্ভব ডিস্ট্র্যাকশন মুক্ত রাখুন : কোনো কাজ করতে নিলে আগে খুঁজে বের করুন কোন কোন জিনিসগুলো আপনাকে কাজটি হতে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে এবং মনোযোগ নষ্ট করতে পারে। প্রয়োজন না হলে ফোন, টিভি, পিসি, ল্যাপটপ থেকে দূরে থাকুন।
  • নিজেকে ফোর্স করুন : অলসতা এবং গড়িমসি স্বভাব কোনোদিনই কোনো টিপ্সে ভালো হবে না যদি না নিজেকে ফোর্স করেন। তাই সবার আগে নিজেকে ফোর্স করা। একঘেয়েমি বা অলসতা কাটাতে নিয়মিত ব্যায়াম করতে পারেন তাতে মস্তিষ্ক সহ শরীরের সর্বাঙ্গে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পাবে এবং আপনাকে চঞ্চল রাখবে।
এসব করেও যদি আপনার সময়ের কাজ সময়ে করতে কষ্ট হয়, মনোযোগ ধরে রাখতে কষ্ট হয়, কাজের প্রতি অহেতুক ভয় কাজ করে তাহলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।
ধন্যবাদ, এখনই কাজে লেগে পড়ুন।
তথ্যসূত্র :

লেখকঃ ইমামুল হাসান ইমরান