আপনার মন যদি অনেক ভালো থাকে, ফুরফুরে লাগে, ফোকাসড লাগে, মনে হয় যে বিশ্ব জয় করে ফেলতে পারবেন তবে সেরোটোনিনকে ছোট্ট একটা ধন্যবাদ দিতে পারেন। সেরোটোনিন হচ্ছে এক ধরনের কেমিক্যাল যা স্নায়ুকোষদের ভিতর তথ্য আদান প্রদান করে। একে মূলত নিউরোট্রান্সমিটার বলা হয় কারণ এই কেমিক্যাল নিউরনের ভিতর তথ্য ট্রান্সমিট করে।

সেরোটোনিন হরমোন হিসেবেও কাজ করে। এই কেমিক্যাল মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষে তো কাজ করেই, সারা শরীরের স্নায়ুকোষেও তথ্য আদান প্রদান করা এর কাজ। অর্থাৎ সেরোটোনিন নামক এই নিউরোট্রান্সমিটারকে স্নায়ুর ভাষা বলা যেতে পারে। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই নিউরোট্রান্সমিটার তৈরি হয় Tryptophan নামক Amino acid থেকে, আর এই এসিড শরীর নিজে বানাতে পারেনা, বাইরের খাবার থেকে শোষণ করতে হয়। মানে খুশি থাকতে হলে খেতে হবে!

সেরোটোনিন তৈরি হয় Tryptophan নামক Amino acid থেকে।

 

কিন্তু এই বস্তু থাকে কোথায়? ৯০% সেরোটোনিনের বসবাস হচ্ছে অন্ত্রে (আমরা যাকে বলি নাড়িভুঁড়ি!) আর বাকি ১০% পাওয়া যায় মস্তিষ্কে। মানে এত্ত গুরুত্বপূর্ণ জিনিস মস্তিষ্কে পাওয়া যায় না, কী অদ্ভুত! অন্ত্রই মূলত বেশিরভাগ সেরোটোনিন ক্ষরণ করে শরীরে যখন এর প্রয়োজন বেড়ে যায়।

এবার এই মক্কেলের কাজ সম্পর্কে আলোচনা করা যাক। সেরোটোনিনের মূল কাজ অনেক রকম আছে। তবে সবথেকে জনপ্রিয় (মানে সাধারণ মানুষ সেরোটোনিনকে এই কাজের জন্যই বেশি চেনে) কাজ হচ্ছে মানুষের মু্ড/মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করা। সেরোটোনিনকে “ভালো লাগা হরমোন” বা “feel good hormone” ও বলা হয়ে থাকে কারণ মানুষের মেজাজের পেছনে সেরোটোনিন অনেকাংশেই দায়ী। অর্থাৎ ইহা কম অর্থ ব্যক্তি বিষন্ন বোধ করবে, ঠিকঠাক থাকলে ব্যক্তি খুশি থাকবে।

সেরোটোনিনকে “ভালো লাগা হরমোন” বা “feel good hormone” ও বলা হয়ে থাকে

তবে কোনোকিছুই আবার বেশি ভালো ভালো নয়। সেরোটোনিন অনেক বেশি থাকলে যে খুব খুশি হবে এমনটা নয়। এই হরমোন বেশি বেড়ে গেলে আবার Serotonin Syndrome নামক এক ঝামেলা শুরু হয় যা নিয়ে পরে কখনো আলাপ করা যাবে। এখন ওসব দিকে না যাওয়াই ভালো। জনপ্রিয় কাজটা বাদ দিলে সেরোটোনিনের আরো গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ উল্লেখ করা যায়, যেমন-

  • সেরোটোনিন খাবার হজমে সহায়তা করে। যেহেতু এটা অন্ত্রেই বেশি থাকে, শরীর যদি দেখে যে এই খাবার খুব দ্রুত হজম করার প্রয়োজন তখন অন্ত্র সেরোটোনিনের ক্ষরণ বাড়িয়ে দেয় যা খাবার হজম করার গতি বাড়িয়ে দেয়। যদি কোনো খাবার পাকস্থলীতে সমস্যা সৃষ্টি করে তখন এই ঘটনা ঘটতে পারে।
  • সেরোটোনিন এবং ডোপামিন, এই দুই হরমোন বান্দা ঘুম নিয়ন্ত্রণে বড়ওও ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ ঘুম ভালো এবং পরিপূর্ণ হবে নাকি তার পেছনে দায়ী এই সেরোটোনিন এবং ডোপামিন। তাছাড়া মেলাটোনিন নামক আরেক হরমোন যা আমাদের ঘুমচক্র নিয়ন্ত্রণ করে তা তৈরি করতে হলেও সেরোটোনিনের দরকার, তাহলে বোঝাই যাচ্ছে সেরোটোনিনের গুরুত্ব “অপরিসীম”!
  • ক্ষত সাড়াতে সেরোটোনিনের গুরুত্ব অনেক। রক্তে থাকা প্লাটিলেট সেরোটোনিন নিঃসরণ করে যখন কোনো ক্ষত সাড়ানোর দরকার পড়ে। সেরোটোনিন দ্বারা ঘটা এক বিশেষ প্রক্রিয়া ছাড়া আমাদের শরীরে হওয়া ক্ষত এতো দ্রুত ঠিক হতো না।
  • সেক্সুয়াল মুডের ক্ষেত্রে সেরোটোনিনের দায়ভার প্রচুর। সেরোটোনিন এবং ডোপামিন কম বেশি হওয়ার ফলে লিবিডো (যৌন চাহিদা) কম বেশি হতে পারে। সেরোটোনিন লেভেল খুব বেশি কমে গেলে মেজাজ তো খারাপ থাকবেই, যৌন আকাঙ্ক্ষারও তীব্র ঘাটতি হতে পারে।

সেরোটোনিন ঘুম নিয়ন্ত্রণে বড়ও ভূমিকা রাখে

এছাড়াও সেরোটোনিন আরো বহু ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে, তবে তা আর লিখছি না।

সেরোটোনিনের এত্ত উপকার দেখে মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে যে কীভাবে এর লেভেল ঠিক রাখা যাবে। এর লেভেল ঠিক রাখার জন্য প্রথম কাজ হচ্ছে Tryptophan Amino Acid সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া যেমন ডিম, পনির, বাদাম, আনারস ইত্যাদি৷ তবে এগুলো খেলেই যে ধুপ করে সেরোটোনিন লেভেল বেড়ে যাবে তাও না, এই ব্যাপারটা একটু কমপ্লেক্স। তবে খাওয়া উচিত। খাবারের সাথে সাথে স্ট্রেসও কম রাখতে হবে। নিয়মিত সঠিক উপায়ে ব্যায়ামও পারে সেরোটোনিন লেভেল ঠিক রাখতে। তাছাড়া সেরোটোনিন বাড়ানোর সাপ্লিমেন্টও আছে যা ডাক্তাররা দেয়, নিজে নিজে খাওয়ার কিছু না। আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সূর্যের রোদ। রোদে ১০-১৫ মিনিট সময় কাটালে সেরোটোনিন লেভেল নিয়ন্ত্রণে থাকে। অনেকসময় দেখা গেছে যারা সূর্যের রোদে বেশি একটা সময় কাটাতে পারেনা তারা বিভিন্ন মুড ডিসঅর্ডারে ভোগে যেমন বিষন্নতা, উদ্বেগ ইত্যাদি।

রোদে ১০-১৫ মিনিট সময় কাটালে সেরোটোনিন লেভেল নিয়ন্ত্রণে থাকে।

উপরোক্ত কাজগুলো অবশ্যই করা উচিত কারণ সেরোটোনিন লেভেল কমে গেলে শুধু মেজাজেরই বারোটা বাজবে না, সাথে ঘুমের সমস্যা, হজমে সমস্যা, ফোবিয়া, ওসিডি ইত্যাদি অনেক ঝামেলা পোহাতে হতে পারে। তাই সেরোটোনিনকে ভালোবাসুন, এর লেভেল ঠিক রাখুন।

লেখকঃ Joy Nandy