আমাদের ‘সময়ের উপলব্ধি’(Perception of Time) অনেকটা বহমান নদীর মত, অর্থাৎ সময় বয়ে চলেছে আর প্রতি মুহূর্তে আমাদের প্রতিটি সিদ্ধান্তের কারণে পরিবর্তন হচ্ছে নদীর দিক। এই ধারণা অনুযায়ী আমরা সময়কে ভাগ করেছি অতীত , বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এই তিন ভাগে। তবে কতটা যুক্তিযুক্ত আমাদের এই ধারণা ?

আচ্ছা, এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে একটা ঘটনা কল্পনা করা যাক; মনে কর তোমার বন্ধু লাবিব মহাকাশে যাচ্ছে বিশ্বের প্রথম ট্রান্সপারেন্ট মহাকাশযানের যাত্রী হয়ে। টেক অফ এর পরে লাবিব তার ঘড়ি অনুযায়ী সকাল ৯:৩০ এ তোমাকে একটা SMS পাঠায় এবং তুমি সকাল ১০ টায় SMS টা পাও ; কিন্তু লাবিব যে সময় তোমাকে SMS লিখছিল তুমি তখন তোমার ছাদে থাকা টেলিস্কোপ এর সাহায্যে লাবিবকে লক্ষ করছিলে এবং তুমি খেয়াল করলে তোমার ঘড়িতে তখন ৯ টা বাজে। অর্থাৎ তুমি সকাল ৯ টায়, ৯:৩০ এ ঘটা একটি ঘটনা দেখতে পেয়েছো। তুমি কি তবে ভবিষ্যৎ দেখেছিলে ? কিন্তু সেটাই বা সম্ভব কিভাবে ?

তোমার বন্ধু লাবিব ট্রান্সপারেন্ট মহাকাশযানের যাত্রী হয়ে মহাকাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

এর ব্যাখা পাওয়া যায় আইনস্টাইন এর স্পেশাল রিলেটিভিটিতে , যা ‘Relativity of simultaneity’ নামে পরিচিত । সহজ ভাষায় এই তত্ত্ব বলে যে, দুইটি ঘটনা একইসাথে (simultaneously) ঘটছে কিনা তা নির্ভর করে কে দেখছে তার উপরে । অর্থাৎ তুমি আর তোমার বন্ধু লাবিব এর Perception of Time আলাদা হলেও ( তোমার ৯ টা , লাবিব এর ৯:৩০ ) তোমার কাছে মনে হয়েছে ঘটনা দুটোই একইসাথে (simultaneously) ঘটেছে ।

আসলে আমরা সময়কে ভিসুয়ালাইজ করি অনেকটা পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশন এর মত , যেখানে স্ক্রীনে ঐমুহূর্তে দেখানো স্লাইড হলো আমাদের বর্তমান এবং আমাদের নেওয়া সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে পরবর্তী স্লাইড তৈরি হয় এবং বর্তমান স্লাইডকে রিপ্লেস করে । কিন্তু থিওরি অফ রিলেটিভিটি অনুসারে আমাদের বর্তমান (Present) আলাদা আলাদা হতে পারে , এবং এটা নির্ভর করে আমাদের গতির উপরে ।

আমরা সময়কে ভিসুয়ালাইজ করি অনেকটা পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশন এর মত।

উপরের ঘটনাকেও এভাবে ব্যাখ্যা করা যায়: ‘লাবিব গতিশীল রকেটে এবং তার সাপেক্ষে তুমি স্থির থাকায় তোমরা দুজন একইসাথে দুটি আলাদা আলাদা বর্তমান(একটি তোমার বর্তমান ও লাবিবের জন্য অতীত এবং অপরটি লাবিবের বর্তমান কিন্তু তোমার জন্য ভবিষ্যৎ) এর অভিজ্ঞতা পেয়েছো ।’ ব্যাপারটাকে তুমি ভাবতে পারো এভাবে, ‘সময়কে আমরা যে পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশন ভাবছি তার সবগুলো স্লাইড আগে থেকেই তৈরি করা আছে এবং আমরা যা-ই করি পরবর্তী স্লাইডে কোনো পরিবর্তন আসবে না । ‘ এই তত্ত্বটি পরিচিত Block Universe Theory নামে ।

Visual representation of Block Universe Theory

Block Universe Theory বলে,’ সব ঘটনাই(অতীত,বর্তমান বা ভবিষ্যতের) স্পেস-টাইম এর একটি ফোর ডাইমেনশনাল ব্লক(Four Dimensional Block) এর অংশ।’ ব্যাপারটিকে আরো সহজে বোঝার জন্য আমরা আরেকটা উদাহরণ কল্পনা করতে পারি- ‘স্পেস-টাইমকে যদি আমরা একটা আস্ত পাউরুটি(Loaf Of Bread) কল্পনা করি তাহলে আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে আমরা ভাবতে পারি পাউরুটির একেকটি টুকরা(Slice of the Loaf) হিসেবে।’ এটি নির্দেশ করে ঠিক অতীতের মতো আমাদের ভবিষ্যতও নির্দিষ্ট ও নির্ধারিত; এবং এর পরিপ্রেক্ষিতেই বলা যায় ‘ভবিষ্যৎ ঘটে গেছে , এখন শুধুই অপেক্ষা এই ঘটে যাওয়া ভবিষ্যৎ ঊপলব্ধি করার ।’

 

তথ্যসূত্রঃ

  1. https://interestingengineering.com/science/block-universe-theory-is-the-passing-of-time-an-illusion.
  2. https://scholar.google.com/scholar?hl=en&as_sdt=0%2C5&q=block+Universe+Theory+&btnG=#d=gs_qabs&t=1711978320977&u=%23p%3Dt9CbN_MJUH4J
  3. https://plus.maths.org/content/what-block-time
  4. https://www.abc.net.au/news/science/2018-09-02/block-universe-theory-time-past-present-future-travel/10178386

 

লেখকঃ প্রথম প্রান্তর